দেশমাতৃকার বীর পুত্র সুশান্ত কুমার বারিকের অকালপ্রয়াণ

SATYAM NEWS

সৌভিক সাহা : ১৯৬৭ সালের ২৮সে মার্চ জন্ম হয়েছিল ভারতের বীর সন্তান সুশান্ত কুমার বারিকের। স্কুলের গন্ডি পেরিয়েই ১৮ বছর ১ মাস বয়সে সেন্ট্রাল রিসার্ভ পুলিশ ফোর্স বা সিআরপিএফে জয়েন করেন তিনি। তারপর আর কোনোদিন থেমে থাকেননি একেরপর এক পরীক্ষায় উর্তীন্ন হয়ে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ তুলে নিয়েছেন হাতে। তিনি ব্লাক ক্যাট কমান্ডো কোর্স পাস করে স্পেশাল প্রটেকশন গ্রুপ বা এসপিজি জয়েন করেন তারপরে হায়দরাবাদের সর্দার বল্লব ভাই প্যাটেল ন্যাশনাল পুলিশ একাডেমিতে জয়েন করেন ট্রেনার হিসেবে। ভারতের সেরার সেরা এই পি এস অফিসারদের নিজের হাতে তৈরী করেছেন , গড়েছেন দেশের তাবড় তাবড় সেনানীদের। সেই ১৮ বছর বয়েসে ঘর ছাড়া হয়ে জীবনের অধিকাংশ সময়টাই দিয়েছিলেন দেশমাতৃকার জন্য।

 

এই যোদ্ধার সাথে আমার আলাপচারিতা ও সম্পর্ক আরো গভীর হয়েছিল ২০০৮ – ২০০৯ সালে। ছোট বেলা থেকেই ওনাকে চিনতাম কিন্তু ওনাকে আরো ভালোভাবে জানলাম ২০০৮ সাল নাগাদ যখন চাকরি সূত্রে আমি হায়দরাবাদে থাকি। ছুটির দিন গুলো ওনার জীবনের কাহিনী জানতে দৌড়ে যেতাম প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে ( সৈনিকপুরী থেকে পুলিশ একাডেমী )। জানতে পেরেছিলাম ৯০ এর দশকের কাশ্মীরের পরিস্থিতি , বলেছিলো কাশ্মীরে জঙ্গিদের সাথে লড়াই করা টা একটা অন্যরকম চ্যালেঞ্জ কারণ চারিদিকে কাঠের বাড়ি আর তারমধ্যেই চলতে থাকে এলোপাথাড়ি গুলি , এ কে ৪৭ (AK 47) ব্যবহার করা খুব সহজ তাই আমাদের ইন্ডিয়ান আর্মি ও জঙ্গিদের প্রথম পছন্দ এ কে ৪৭(AK 47) কিন্তু সুশান্ত কুমার বারিক সেখানেও আলাদা ওনার পছন্দের অস্ত্র ছিল এ কে ৫৬ (AK 56) কারণ ৩.৮ কিলোগ্রামের এই মেশিন ছিল ৪০০ মিটার রেঞ্জের ঘাতক অস্ত্র। কাশ্মীরে জঙ্গিরা প্রধানত বোরখা পরে নজর এড়ানোর চেষ্টা করলেও পায়ের বুট দেখে তাদের সনাক্ত করতে হতো আর কোথাও বিচক্ষণতার অভাব ঘটলেই চরম শাস্তি মৃত্যু ! মৃত্যর সাথে এভাবেই দৈনিন্দিন লড়াই করতে হতো কাশ্মীরে আর প্রতিদিন নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার লড়াইটাই ছিল সেই চাকরির তৃপ্তি। সুশান্ত কুমার বারিক বার বার বলতেন ডিফেন্সে চাকরিটাকে চাকরি মনে করলে হবে না এটা দেশের সেবা দেশমাতৃকার প্রতি ছেলের শ্রদ্ধা

সালটা ২০০৯ মাসটা সেপ্টেম্বর কি ঘটেছিলো ? অন্ধ্র প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী ওয়াই এস রাজশেখর রেড্ডি, হায়দ্রাবাদের পুরানো বেগমপেট বিমানবন্দর থেকে একটি বেল ৪৩০ (Bell 430) হেলিকপ্টারে সকাল ৮.৩৮ এ অন্ধ্র প্রদেশের দক্ষিণ চিত্তুর জেলার একটি গ্রামের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিলেন, কিন্তু ফ্লাইটের ৩৫ মিনিটের মধ্যে হেলিকপ্টারটি এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলারের সাথে যোগাযোগ হারিয়ে ফেলে। সেই সময়ে,হেলিকপ্টারটি মাটি থেকে প্রায় ১.২৫ কিলোমিটার উচ্চতায় উড়ছিল এবং হায়দ্রাবাদ থেকে ১৪০ কিলোমিটার দূরে ছিল, ডিরেক্টরেট জেনারেল অফ সিভিল এভিয়েশন এমনটাই জানিয়েছে। স্পেশাল কমান্ডোদের টীম তৈরী হলো। প্রায় ৮০০ স্পেশাল কমান্ডো , প্যারামিলিটারি , পুলিশ ফোর্স মুখ্যমন্ত্রীর খোঁজে রওনা দিলো নল্লামালা জঙ্গলে যা কুর্নুল, প্রকাশম এবং কাদাপা জেলা জুড়ে বিস্তৃত এবং নকশালদের উপস্থিতি রয়েছে বলে মনে করা হতো। এই দলের এক প্রধান ভাগের দায়িত্ব এলো সেই সুশান্ত কুমার বারিকের ওপরে। সারাজীবনের মতো এখানেও তার হার না মানা জেদ ও অদম্য ইচ্ছেশক্তির জোরে ওই জঙ্গল সার্চ অপেরেশনে অবশেষে খুঁজে পাওয়া গেলো ওয়াই এস রাজশেখর রেড্ডি ও ৫ জনের মৃতদেহ ও ধ্বংস হয়ে যাওয়া হেলিকোপটার। অপারেশন শেষে অবশেষে নিজের টীম নিয়ে ঘরে ফিরলো কমান্ডো সুশান্ত কুমার বারিক এটা ছিল তার জীবনের আরো এক স্বর্ণালী পালক।

জীবনের সব হিসেবে মেলে না। শেষ জীবনে পরিবারের পাশে থাকবে বলে ভলান্টিয়ারি রেটিয়ারমেন্ট নিয়ে ঘরে ফেরেন সুশান্ত কুমার বারিক। ছেলে এন ডি এ পাস্ করে এয়ারফোর্সে যোগ দিয়েছে , ১৬ মাস আগে হারিয়েছেন সহধর্মিণীকে। একাকী জীবনে উনি মনেহয় রোজই মেলাতেন জীবনের হিসেবে নিকেশ। সারাজীবন জীবনের সাথে পাঞ্জা লড়েছেন আর প্রতিটা লড়াই জিতে এসেছেন কিন্তু জীবন চলবে জীবনের মতো তার ছন্দে তাই নিজ বাসস্থানে ২ রা জুলাই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে চিরজীবনের মতো পরলোক পারি দিলেন আমাদের দেখা ” রিয়েল হিরো “ দেশের বীর সন্তান সুশান্ত কুমার বারিক। ওনার মৃত্যুতে স্থানীয় চুঁচড়া থানার আইসি , এসপি এবং চন্দননগরের সিপি উপস্থিত ছিলেন । চুঁচুড়া হসপিটালে ওনাকে নিয়ে যাওয়া হয় পুলিশের অ্যাম্বুলেন্স করে এবং পুলিশ স্কাউট করে ওনার শেষ যাত্রা প্রদক্ষিণ করে বাড়ি থেকে পুরনো বাড়ির এবং দেবী পার্ক দুর্গা মন্দির দিয়ে চন্দননগর বরাই চন্ডীতলা ঘাটে দাহ করা হয়, মৃত্যুকালে ওনার বয়স হয়েছিল ৫৭।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *